৮ কার্তিক ১৪৩৩ , শুক্রবার   ২৩ অক্টোবর ২০২৬

চার জেলায় ৪৭ কোটি টাকার প্রকল্প, বাড়বে মাছের উৎপাদন ও জেলেদের আয়

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ১২:০৮,২৩ অক্টোবর ২০২৬

চার জেলায় ৪৭ কোটি টাকার প্রকল্প, বাড়বে মাছের উৎপাদন ও জেলেদের আয়

ছবি: সংগৃহীত

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের চার জেলার ২৯টি বাঁওড়ের মৎস্যসম্পদ উন্নয়ন এবং প্রকৃত মৎস্যজীবীদের জীবনমান পরিবর্তনে ৪৭ কোটি ৫৫ লাখ টাকা ব্যয়ের একটি প্রকল্প প্রস্তাব করেছে মৎস্য অধিদপ্তর। পাঁচ বছর মেয়াদি এ প্রকল্পের আওতায় বাঁওড় খনন, মাছের অভয়াশ্রম প্রতিষ্ঠা, পোনা উৎপাদন, অবকাঠামো উন্নয়ন ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে মাছের উৎপাদন অন্তত ১০ শতাংশ বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

‘নির্বাচিত বাঁওড় এলাকায় সমাজভিত্তিক মৎস্যসম্পদ ব্যবস্থাপনা’ শীর্ষক প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে যশোর, ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা ও কুষ্টিয়া জেলার বাঁওড়নির্ভর জেলেদের জীবিকা ও আয় বাড়ানোর পাশাপাশি জলজ সম্পদ সংরক্ষণেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে যশোরের জেলা প্রশাসক ওই অঞ্চলের বাঁওড়গুলোতে মাছের উৎপাদন বাড়াতে প্রকল্প গ্রহণের উদ্যোগ নেন। ওই বছরের ডিসেম্বরে জেলা প্রশাসকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব, যুগ্ম সচিব, মৎস্য বিভাগের প্রতিনিধি ও স্থানীয় ব্যক্তিরা অংশ নেন। সভায় এ বিষয়ে প্রকল্প গ্রহণের সিদ্ধান্ত হয়।

এর ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে তৎকালীন সচিবের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় প্রকল্পটি অনুমোদন পায়। পরে প্রকল্পের জনবলকাঠামো অনুমোদনের জন্য অর্থ বিভাগে প্রস্তাব পাঠানো হয়। বর্তমান সরকারের সময়ে জনবলকাঠামো অনুমোদনের পর প্রকল্পের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। বর্তমানে প্রকল্পটির ব্যয় ও কার্যক্রম মূল্যায়নের অপেক্ষায় রয়েছে।

খনন ও অভয়াশ্রমে গুরুত্ব


প্রকল্পের আওতায় পলি জমে ভরাট হয়ে যাওয়া বাঁওড়ের নির্বাচিত অংশ খনন করে গভীরতা ও পানি ধারণক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এ খাতে ১১ কোটি ২১ লাখ ৯৫ হাজার টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে শুষ্ক মৌসুমেও মাছের বসবাস ও বেড়ে ওঠার উপযোগী পরিবেশ তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

দেশীয় প্রজাতির মাছ সংরক্ষণ এবং প্রাকৃতিক প্রজননের সুযোগ বাড়াতে ২৯টি বাঁওড়ে অভয়াশ্রম প্রতিষ্ঠার জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে ২ কোটি ৩২ লাখ টাকা। অভয়াশ্রমের নির্ধারিত এলাকায় মাছ আহরণ নিয়ন্ত্রিত থাকবে, যাতে মাছ নির্বিঘ্নে প্রজনন ও বংশবিস্তার করতে পারে।

এ ছাড়া বিদ্যমান ৩৫টি পোনা উৎপাদন পুকুর সংস্কারে ১ কোটি ৭৩ লাখ ৩৯ হাজার টাকা, খামার যান্ত্রিকীকরণে ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা এবং পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে ছয়টি গভীর নলকূপ স্থাপনে ১ কোটি ২০ লাখ টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে।

পোনা উৎপাদন ও অবকাঠামো উন্নয়ন

বাঁওড়ের মাছের উৎপাদন বাড়াতে পাঁচ বছরে ২৯০টি বিল নার্সারি স্থাপনের জন্য ২ কোটি ৯০ লাখ টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। এসব নার্সারিতে পোনা লালন-পালন ও উৎপাদন কার্যক্রম বাড়ানো হবে। পাশাপাশি রুইজাতীয় ও দেশীয় প্রজাতির মাছের পোনা অবমুক্ত করতে পৃথকভাবে ৭ কোটি ৬১ লাখ ৯৩ হাজার টাকার সংস্থান রাখা হয়েছে।


বাঁওড় ব্যবস্থাপনা, প্রশিক্ষণ, পোনা সরবরাহ ও সম্প্রসারণ কার্যক্রম জোরদারে জরাজীর্ণ ছয়টি বাঁওড় ব্যবস্থাপকের অফিস ভবন পুনর্নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে। এ জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে ৭ কোটি ৩১ লাখ ৮ হাজার টাকা। প্রকল্পের সরঞ্জাম কেনার জন্য রাখা হয়েছে আট লাখ টাকা। এ অর্থে চারটি ডেস্কটপ কম্পিউটার, দুটি ল্যাপটপ, চারটি প্রিন্টার ও আনুষঙ্গিক সরঞ্জাম কেনার পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রকল্পের এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে মাছের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি বাঁওড়ের প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণ এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণে টেকসই মৎস্যসম্পদ ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

প্রকৃত মৎস্যজীবীদের তালিকা হালনাগাদ

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন, বাঁওড়গুলোতে মাছের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি স্থানীয় মৎস্যজীবীদের সম্পৃক্ত করে কার্যকর ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলাই প্রকল্পের প্রধান লক্ষ্য। অভয়াশ্রমে মাছ আহরণ নিয়ন্ত্রিত থাকলেও বর্ষায় মাছ আশপাশের নদী ও বিলে ছড়িয়ে পড়লে সেখান থেকে জেলেরা মাছ আহরণ করতে পারবেন।

তিনি জানান, প্রকল্পটি বর্তমানে মূল্যায়নাধীন রয়েছে। প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় পর্যালোচনার পর এ বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।


মৎস্য অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক মো. খালেদ কনক বলেন, এটি একটি সমাজভিত্তিক মৎস্য উন্নয়ন প্রকল্প। দীর্ঘদিন ধরে বাঁওড়ের জেলেদের জীবনমান উন্নয়নে এ ধরনের প্রকল্পের অভাব ছিল।

তিনি জানান, প্রকল্পের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য প্রকৃত মৎস্যজীবীদের তালিকা হালনাগাদ করা। নব্বইয়ের দশকে গঠিত মৎস্যজীবী সমিতিগুলোর সদস্য তালিকা দীর্ঘদিন ধরে হালনাগাদ হয়নি। প্রকল্পের মাধ্যমে প্রকৃত মৎস্যজীবীদের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা, তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং প্রকল্পের সুফল সুষমভাবে বণ্টনের সুযোগ তৈরি হবে।

সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, প্রকল্পটি অনুমোদন ও বাস্তবায়িত হলে চার জেলার বাঁওড়গুলোর মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণ, মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং প্রকৃত জেলেদের দীর্ঘমেয়াদি জীবিকা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ইতিবাচক অগ্রগতি হবে।

শহীদ

আরও পড়ুন

শীর্ষ সংবাদ: