ক্ষমতার উৎস কোথায়?
সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজের অধ্যক্ষের পদায়ন ঘিরে প্রশ্ন
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ২০:১১,৪ নভেম্বর ২০২৬
ছবি: নিউজমিশন২৪
জাতির মেরুদণ্ড শিক্ষাব্যবস্থার কারিগর, বিশেষ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান যখন রাজনৈতিক প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠতে না পেরে দ্বিচারিতায় ভোগেন, আর তা যদি হয় ‘এ’ ক্যাটাগরির একটি সরকারি কলেজের অধ্যক্ষের ক্ষেত্রে, তখন দেশের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার জীর্ণশীর্ণ অবস্থাই প্রকাশ পায়।
জামালপুর-শেরপুর অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী ও সর্বাধিক স্বনামধন্য বিদ্যাপীঠ সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজ, জামালপুরের বর্তমান অধ্যক্ষ বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারের ১৮তম ব্যাচের অধ্যাপক মো. আব্দুল বার্সেদ। তিনি ১৯৯৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক হিসেবে গাইবান্ধা সরকারি কলেজে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছিলেন।
ইতোপূর্বে তিনি ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বর মাস থেকে সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজে সহকারী অধ্যাপক (৮ বছর), সহযোগী অধ্যাপক (৫ বছর) এবং অধ্যাপক (১ বছর) হিসেবে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রায় টানা ১৪ বছর শিক্ষকতা করেছেন।
পরবর্তীতে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ ও তার নেতৃত্বাধীন সরকারের অন্যতম প্রভাবশালী নেত্রী, সাবেক সংসদ সদস্য ও কৃষিমন্ত্রী প্রয়াত বেগম মতিয়া চৌধুরীর আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে ২০২৩ সালের নভেম্বরে তিনি সরকারি হাজী জাল মামুদ কলেজ, নকলা, শেরপুরের অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। সেখানে তিনি প্রায় ২ বছর ১০ মাস দায়িত্ব পালন করেন। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের আশীর্বাদপুষ্ট হয়েও ৫ আগস্ট ২০২৪-পরবর্তী সময়েও তিনি বহাল তবিয়তে ছিলেন। উপরন্তু, বর্তমানে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে গত ৩০ আগস্ট ২০২৬ তারিখে তিনি সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজ, জামালপুরের অধ্যক্ষ হিসেবে নতুন দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
কিন্তু বিধিমালা অনুযায়ী, চতুর্থ গ্রেডের অধ্যাপক তৃতীয় গ্রেডের সুযোগ-সুবিধাভোগী অধ্যক্ষ হিসেবে পদায়নের বিধান থাকলেও ‘সি ক্যাটাগরি’র কলেজ (সরকারি হাজী জাল মামুদ ডিগ্রি কলেজ, নকলা, শেরপুর) থেকে সরাসরি ‘এ ক্যাটাগরি’র কলেজ (সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজ, জামালপুর)-এর অধ্যক্ষ হিসেবে পদায়নের অদ্যাবধি কোনো নজির নেই।
মূলধারার জাতীয় গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ না হলেও বিভিন্ন সময়ে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র বিভ্রাট ও অভ্যন্তরীণ কিছু বিষয়ে অসংগতির কারণে তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়, যা পরবর্তীতে অজ্ঞাত কারণে আলোর মুখ দেখেনি।
সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে গত ২৮ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে যোগদান করা অধ্যাপক মো. শওকত আলম মীর গত ২৭ আগস্ট ২০২৬ তারিখে অবসরোত্তর ছুটিতে যান। অথচ ২১ জুলাই ২০২৬ তারিখেই, অর্থাৎ তাঁর যোগদানের প্রায় ৪০ দিন আগেই, সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে অধ্যাপক মো. আব্দুল বার্সেদকে পদায়নের প্রজ্ঞাপন জারি করে মাউশি, যা দূরভিসন্ধিমূলক বলে অভিযোগ উঠেছে।
ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নিয়োগ, সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজ, জামালপুরে টানা প্রায় ১৪ বছর শিক্ষকতা, প্রশ্নপত্র বিভ্রাট, তদন্ত কমিটি গঠন এবং সেগুলোর প্রতিবেদন আলোর মুখ না দেখা, ৫ আগস্ট ২০২৪-পরবর্তী সময়েও বহাল তবিয়তে টিকে থাকা এবং সর্বশেষ অধ্যাপক মো. শওকত আলম মীর স্বপদে বহাল থাকাকালে সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে অধ্যাপক মো. আব্দুল বার্সেদকে পদায়নের প্রজ্ঞাপন তাঁর যোগদানের প্রায় ৪০ দিন আগে মাউশি কর্তৃক জারি করা—এসব বিষয়কে কেন্দ্র করে অনুসন্ধান শুরু করা হয়।
অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, অধ্যাপক মো. আব্দুল বার্সেদ সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে পদায়নের জন্য গত ২৮ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে ইস্যুকৃত প্রাইম ব্যাংক, জামালপুর শাখার চেক বইয়ের কয়েকটি পাতায় তাঁর স্বাক্ষরসহ ফাঁকা চেক এবং তাঁর স্বাক্ষরিত ১০ লাখ টাকার একটি ঋণসংক্রান্ত চুক্তিপত্র একটি বিশেষ সিন্ডিকেটের কাছে হস্তান্তরের প্রমাণ পাওয়া যায়।
বর্তমান অধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. আব্দুল বার্সেদ কর্তৃক প্রদানকৃত চেক, ঋণসংক্রান্ত চুক্তিপত্র ও সংশ্লিষ্ট প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ে অর্থ পরিশোধ না করায় উক্ত সিন্ডিকেটের সদস্যরা গত ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে জামালপুরে আসেন।
১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখ দিবাগত রাত ৮টা থেকে ১১টা পর্যন্ত জামালপুরস্থ পিটিআইয়ের সামনে অবস্থিত মিজান ট্রেডার্সের একটি কক্ষে বর্তমান অধ্যক্ষের সঙ্গে থাকা ব্যক্তিদের এবং বিশেষ সিন্ডিকেটের সদস্যদের মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই সময় সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজ, জামালপুরের নামসংবলিত গাড়িটি মিজান ট্রেডার্সের সামনের রাস্তার পাশে পার্ক করা ছিল। অতঃপর জামালপুরের নতুন বাইপাস-সংলগ্ন দারুচিনি রেস্টুরেন্টে বিশেষ সিন্ডিকেটের সদস্যদের আপ্যায়ন করিয়ে বিদায় জানান বর্তমান অধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. আব্দুল বার্সেদ।
অধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. আব্দুল বার্সেদ সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজে যোগদানের পর থেকেই চলমান সার্বিক অবকাঠামোগত উন্নয়ন কার্যক্রমে অযাচিত হস্তক্ষেপ করে আসছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।
ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের দোসর হিসেবে পরিচিত ব্যক্তিকে জামালপুর-শেরপুর অঞ্চলের স্বনামধন্য ও সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে পদায়ন করা নিতান্তই দুঃখজনক ও অনভিপ্রেত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ নিয়ে জামালপুরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহলসহ সুশীল সমাজের মধ্যে সমালোচনা এবং পুরো অঞ্চলের মানুষের মধ্যে চরম ক্ষোভ পরিলক্ষিত হচ্ছে।
অধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. আব্দুল বার্সেদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে মুঠোফোনে পাওয়া যায়নি।
শহীদ