৯ কার্তিক ১৪৩৩ , শনিবার   ২৪ অক্টোবর ২০২৬

সাংবাদিকের ডিজিটাল নিরাপত্তা কতটা সুরক্ষিত?

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ২৩:১২,২৩ অক্টোবর ২০২৬

সাংবাদিকের ডিজিটাল নিরাপত্তা কতটা সুরক্ষিত?

ছবি: সংগৃহীত

একটি ই-মেইল। প্রেরক নিজেকে চীনের সাবেক বিচারিক সহকারী পরিচয় দিয়ে দাবি করলেন, তার কাছে ১ কোটি ডলারের আত্মসাৎ-সংক্রান্ত গোপন নথি রয়েছে। অনুসন্ধানী সাংবাদিকের জন্য এমন তথ্য উপেক্ষা করা কঠিন। নথি দেখতে একটি লিংকও পাঠালেন তিনি। কিন্তু সেটি ছিল প্রতারণার ফাঁদ। উদ্দেশ্য ছিল সাংবাদিকের লগইন তথ্য হাতিয়ে নেওয়া।

২০২৫ সালের জুনে আন্তর্জাতিক অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল কনসোর্টিয়াম অব ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্টসের (আইসিআইজে) এক সাংবাদিক এমন ই-মেইল পান। পরে সংগঠনটি জানায়, কথিত তথ্যদাতার পরিচয় ছিল ভুয়া। সিটিজেন ল্যাবের গবেষকেরা ঘটনাটি বিশ্লেষণ করে একে সাংবাদিকদের লক্ষ্য করে চালানো বৃহত্তর একটি প্রচারণার অংশ বলে শনাক্ত করেন। 

এই ঘটনাটি সাংবাদিকের কাজের সঙ্গে ডিজিটাল নিরাপত্তার সম্পর্ক কতটা গভীর তা দেখিয়ে দেয়। একটি আকর্ষণীয় তথ্য, অচেনা সূত্র কিংবা জরুরি কোনো নথির লিংকও ব্যক্তিগত তথ্য, সংবাদসূত্র ও অনুসন্ধানের গোপনীয়তা নষ্ট করার হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।

মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির রয়টার্স ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব জার্নালিজমের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব ঝুঁকি নিয়ে কথা বলেছেন রুনা স্যান্ডভিক। তিনি দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের সাবেক পরিচালক (তথ্যনিরাপত্তা) এবং বর্তমানে সাইবার সিকিউরিটি বিষয়ক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান গ্রানিটের প্রতিষ্ঠাতা। বিশ্বজুড়ে সাংবাদিক ও সংবাদকক্ষকে ডিজিটাল ঝুঁকি মোকাবিলায় সহায়তা করেন তিনি।

 

স্যান্ডভিকের ভাষ্য অনুযায়ী, ডিজিটাল নিরাপত্তাকে শুধু প্রযুক্তি বিভাগের দায়িত্ব হিসেবে দেখলে চলবে না। সংবাদ সংগ্রহ, সূত্রের সঙ্গে যোগাযোগ, তথ্য যাচাই ও প্রতিবেদন প্রকাশের পরিকল্পনার মধ্যেই নিরাপত্তার বিষয়টি রাখতে হবে।

হুমকি শুধু হ্যাকিংয়ে সীমাবদ্ধ নয়

সাংবাদিকদের ডিজিটাল ঝুঁকি বলতে অনেকেই ই-মেইল বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট হ্যাক হওয়ার কথা ভাবেন। বাস্তবে হুমকির ধরন আরও বিস্তৃত। নজরদারি সফটওয়্যার, ভুয়া পরিচয়ে যোগাযোগ, অনলাইন হয়রানি, ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি প্রতারণামূলক বার্তা—সবই সাংবাদিকদের লক্ষ্যবস্তু করতে ব্যবহৃত হতে পারে।

স্যান্ডভিকের পর্যবেক্ষণ, কোনো সংবাদ প্রকাশের পর কারও প্রতিক্রিয়া কত দূর যেতে পারে, তা আগে থেকে অনুমান করা কঠিন। কোনো পোস্টে ক্ষুব্ধ হয়ে কেউ সাংবাদিকের অ্যাকাউন্টে প্রবেশের চেষ্টা করতে পারেন। আবার একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পর সাংবাদিকের বিরুদ্ধে সমন্বিতভাবে নানা ধরনের আক্রমণও হতে পারে।

আক্রমণকারী সব সময় সাংবাদিকের ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে প্রবেশের চেষ্টা করবেন, এমন নয়। পরিস্থিতি অনুযায়ী ভ্রমণে বাধা, দেশ থেকে বহিষ্কার, আইনি চাপ কিংবা ব্যক্তিগত হয়রানিও হতে পারে। অর্থাৎ ডিজিটাল হুমকির প্রভাব অনলাইনেই থেমে থাকে না, তা সাংবাদিকের কাজ ও ব্যক্তিগত জীবনেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।

গত পাঁচ বছরে এসব ঝুঁকির ধরন ও ব্যাপ্তি বদলেছে বলে মনে করেন স্যান্ডভিক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বট ব্যবহার, বিপুলসংখ্যক ভুয়া অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে প্রচারণা এবং অনলাইনে তথ্য বিকৃত করা আগের চেয়ে সহজ হয়েছে। একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে আসল ওয়েবসাইটের মতো দেখতে ভুয়া লগইন পেজ তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে প্রতারণামূলক লিংক চেনা আরও কঠিন হয়ে উঠছে।

নজরদারি করা সফটওয়্যারের ঝুঁকি

সাংবাদিকদের জন্য বড় উদ্বেগের আরেকটি জায়গা স্পাইওয়্যার বা নজরদারি করা সফটওয়্যার। এ ধরনের সফটওয়্যার কোনো ব্যক্তির অজান্তে তার মুঠোফোন বা কম্পিউটারের তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। এর মাধ্যমে যোগাযোগ, ব্যক্তিগত তথ্য এবং সংবাদসূত্রের পরিচয় ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

স্যান্ডভিকের মতে, স্পাইওয়্যার নতুন কিছু নয়। অতীতে হ্যাকিং টিমের মতো প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন সরকারের কাছে নজরদারির প্রযুক্তি বিক্রি করেছে। পরে এনএসও গ্রুপের পেগাসাস এবং ইন্টেলেক্সার প্রিডেটরের মতো সফটওয়্যারও আলোচনায় এসেছে।

নাগরিক সমাজের বিভিন্ন অংশের ওপর অত্যাধুনিক নজরদারি প্রযুক্তি ব্যবহারের ঘটনা উদ্বেগজনক বলে মনে করেন তিনি। তবে একই সঙ্গে এসব আক্রমণ শনাক্ত ও প্রতিরোধের সক্ষমতাও বাড়ছে।

২০২৬ সালে গ্রিসের সাংবাদিক ও ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সাবেক সদস্য স্তেলিওস কুলোগলুর ফোন পেগাসাস স্পাইওয়্যারে আক্রান্ত হওয়ার তথ্য প্রকাশ করে সিটিজেন ল্যাব। ঘটনাটি আবারও দেখিয়েছে, পরিচিত ও অভিজ্ঞ সাংবাদিকও এমন ঝুঁকির বাইরে নন।

নিরাপদ অ্যাপ ব্যবহার করলেই কি ঝুঁকি কমে?

সাংবাদিকদের মধ্যে নিরাপদ যোগাযোগের অ্যাপ ব্যবহারের প্রবণতা বেড়েছে। কিন্তু শুধু নিরাপদ অ্যাপ ব্যবহার করলেই সব ঝুঁকি দূর হয় না। কীভাবে, কোন ডিভাইসে এবং কোন পরিস্থিতিতে অ্যাপটি ব্যবহার করা হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

এ প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদকের ঘটনা তুলে ধরেছেন স্যান্ডভিক। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে এফবিআই ওই প্রতিবেদকের বাড়িতে তল্লাশি চালায়। তিনি সংবাদসূত্রের সঙ্গে যোগাযোগে সিগন্যাল অ্যাপের অদৃশ্য হয়ে যাওয়া বার্তার সুবিধা ব্যবহার করতেন। স্যান্ডভিকের মতে, অ্যাপ ও সেটিংসের দিক থেকে এটি ছিল নিরাপদ পদ্ধতি।

কিন্তু প্রতিবেদকের ফোনের সিগন্যাল অ্যাকাউন্টটি অফিসের ল্যাপটপের সঙ্গেও যুক্ত ছিল। ল্যাপটপে বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে প্রবেশের ব্যবস্থা থাকায় তদন্তকারীরা ডিভাইসটি ব্যবহার করে সিগন্যাল অ্যাকাউন্টে ঢুকতে পেরেছিলেন বলে স্যান্ডভিক উল্লেখ করেন।

এই ঘটনা থেকে তার শিক্ষা— নিরাপত্তার ক্ষেত্রে শুধু সঠিক প্রযুক্তি বেছে নেওয়া যথেষ্ট নয়, পুরো কাজের প্রক্রিয়াও বিবেচনায় নিতে হবে। কোন ডিভাইসে তথ্য রাখা হচ্ছে, ব্যক্তিগত ও অফিসের অ্যাকাউন্ট কীভাবে যুক্ত, কোনো ডিভাইস অন্যের হাতে গেলে কী তথ্য উন্মুক্ত হতে পারে—এসব প্রশ্নের উত্তর আগেই ভেবে রাখা দরকার।

নিরাপত্তা পরিকল্পনায় সম্পাদকের ভূমিকা

দ্রুত সংবাদ প্রকাশের চাপ সংবাদকক্ষের নিত্যদিনের বাস্তবতা। এর মধ্যে আলাদা করে নিরাপত্তার পরিকল্পনা করা অনেক সময় বাড়তি কাজ মনে হতে পারে। স্যান্ডভিকের মতে, সব প্রতিবেদনের জন্য একই মাত্রার নিরাপত্তা প্রয়োজন না হলেও কোন কাজে বাড়তি সতর্কতা দরকার, তা বুঝতে হবে।

তার পরামর্শ—অভ্যাস পরিবর্তনের আগে কেন তা প্রয়োজন, সেটি বুঝতে হবে। একই সঙ্গে নতুন পদ্ধতি অনুসরণ যেন বাস্তবে সম্ভব হয়, সেই ব্যবস্থাও রাখতে হবে। প্রতিটি কাজেই সর্বোচ্চ নিরাপত্তার ব্যবস্থা নিতে গেলে কাজের গতি কমতে পারে। তাই ঝুঁকি বুঝে নিরাপত্তার মাত্রা নির্ধারণ করতে হবে।

এ ক্ষেত্রে সম্পাদকের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবেদক কোনো সংবেদনশীল অনুসন্ধান শুরু করলে সম্পাদক তাকে প্রশ্ন করতে পারেন—সূত্রের পরিচয় কীভাবে সুরক্ষিত থাকবে? কোন মাধ্যমে যোগাযোগ করা হবে? ডিভাইসের নিরাপত্তা সেটিংস ঠিক আছে কি না? কোনো বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রয়োজন কি না?

স্যান্ডভিকের মতে, সংবাদকক্ষের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগ, ব্যবস্থাপনা ও সম্পাদকীয় নেতৃত্বও এ কাজে সহায়তা করতে পারে। নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা শুধু আক্রমণের পর শুরু হলে চলবে না, কাজ শুরুর আগেই ঝুঁকি চিহ্নিত করা দরকার।

ব্যক্তিগত তথ্যও হতে পারে আক্রমণের হাতিয়ার

ডক্সিং হলো কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত তথ্য তার সম্মতি ছাড়া প্রকাশ করে দেওয়া, যা অনেক সময় হয়রানি বা ভয় দেখানোর কাজে ব্যবহার করা হয়। সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে বাড়ির ঠিকানা, ফোন নম্বর, পুরোনো অনলাইন অ্যাকাউন্ট কিংবা পরিবারের সদস্যদের তথ্য প্রকাশ করে তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হতে পারে।

স্যান্ডভিকের মতে, ডক্সিং পুরোপুরি ঠেকানো সব সময় সম্ভব নয়, তবে প্রস্তুতি নেওয়া যায়। অনলাইনে নিজের সম্পর্কে কী তথ্য পাওয়া যায়, তা খুঁজে দেখা, অপ্রয়োজনীয় পুরোনো অ্যাকাউন্ট বন্ধ করা এবং যেসব তথ্য প্রকাশ না করাই ভালো, সেগুলোর গোপনীয়তা বাড়ানো সহায়ক হতে পারে।

অনলাইন হয়রানির শিকার ব্যক্তি, তার সহকর্মী ও নিয়োগদাতাদের করণীয় জানতে পেন আমেরিকার অনলাইন হ্যারাসমেন্ট ফিল্ড ম্যানুয়াল ব্যবহারের পরামর্শও দিয়েছেন তিনি। কেউ হয়রানির শিকার হলে সহকর্মীদের সহায়তাও গুরুত্বপূর্ণ। সংবাদকক্ষে আগে থেকেই এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলার নিয়ম থাকলে আক্রান্ত সাংবাদিককে সহায়তা করা এবং দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া সহজ হয়।

ডিজিটাল নিরাপত্তা সাংবাদিকতারই অংশ

স্যান্ডভিকের পরামর্শের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, নিরাপত্তাকে সংবাদ তৈরির প্রক্রিয়া থেকে আলাদা করে না দেখা। প্রতিবেদন তৈরির সময় যেমন তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা, সূত্রের বক্তব্য ও বিভিন্ন পক্ষের মতামত বিবেচনা করা হয়, তেমনি সাংবাদিক, তার সূত্র এবং সংগৃহীত তথ্যের নিরাপত্তাও বিবেচনায় রাখা উচিত।

এ জন্য সব সময় জটিল প্রযুক্তি বা ব্যয়বহুল ব্যবস্থা প্রয়োজন হয় না। ডিভাইসের সফটওয়্যার হালনাগাদ রাখা, অ্যাকাউন্টের নিরাপত্তা সেটিংস পর্যালোচনা করা এবং অচেনা লিংকে ক্লিক করার আগে সতর্ক হওয়া গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তবে সংবেদনশীল অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে আরও বিস্তারিত পরিকল্পনা প্রয়োজন হতে পারে।

ঝুঁকি নিয়ে সহকর্মীদের সঙ্গে আলোচনা করা এবং নিরাপদে কাজ করার পদ্ধতি আগে থেকে ঠিক করে রাখা জরুরি বলে মনে করেন স্যান্ডভিক। একা একা সব ঝুঁকি সামলানোর চেষ্টা না করে সংবাদকক্ষের সমন্বিত সহায়তা নেওয়াই কার্যকর।

সাংবাদিকতার কাজ শুধু তথ্য সংগ্রহ ও প্রকাশ করা নয়। তথ্যের উৎসকে সুরক্ষিত রাখা, পাঠকের আস্থা বজায় রাখা এবং সাংবাদিকের নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও এর অংশ। ডিজিটাল ঝুঁকি যখন ক্রমেই জটিল হচ্ছে, তখন নিরাপত্তার পরিকল্পনাকে সংবাদকক্ষের দৈনন্দিন কাজের অংশ করে তোলার প্রয়োজনীয়তাও বাড়ছে।

শহীদ

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন


Fatal error: Uncaught mysqli_sql_exception: You have an error in your SQL syntax; check the manual that corresponds to your MariaDB server version for the right syntax to use near ') AND bn_content.CategoryID=17 ORDER BY bn_content.ContentID DESC LIMIT 4' at line 1 in /home/uem25w1i/public_html/details.php:521 Stack trace: #0 /home/uem25w1i/public_html/details.php(521): mysqli_query() #1 {main} thrown in /home/uem25w1i/public_html/details.php on line 521