পবিত্র কোরআনের চোখে অবাধ্য সন্তান
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ০০:১১,২৪ অক্টোবর ২০২৬
ছবি: সংগৃহীত
সন্তান আল্লাহর অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিয়ামত। যার সন্তান হয় না সে জানে পৃথিবীর সব কিছুর চেয়েও একটি সন্তান বেশি মূল্যবান। আল্লাহ তাআলা মানুষকে এই নিয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন এভাবে : ‘আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর আধিপত্য আল্লাহরই। তিনি যা ইচ্ছা তা-ই সৃষ্টি করেন। তিনি যাকে ইচ্ছা কন্যাসন্তান দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা পুত্রসন্তান দান করেন অথবা দান করেন পুত্র ও কন্যা উভয়ই এবং যাকে ইচ্ছা করে দেন বন্ধ্যা; তিনি সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমান।’ (সুরা শুরা, আয়াত : ৪৯-৫০)
সন্তান-সন্ততি পার্থিব জীবনের সৌন্দর্য : সঠিক শিক্ষা-দীক্ষায় সন্তান প্রতিপালন করলে তা দুনিয়া ও আখিরাতে অযুত কল্যাণের উত্স। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি পার্থিব জীবনের সৌন্দর্য। স্থায়ী সত্কর্ম তোমার রবের কাছে পুরস্কারপ্রাপ্তির জন্য শ্রেষ্ঠ এবং আশান্বিত হওয়ার জন্যও সর্বোত্কৃষ্ট।’ (সুরা : কাহফ, আয়াত : ৪৬)
সন্তানের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ মা-বাবার অন্যতম দায়িত্ব : মহান আল্লাহ মা-বাবার ওপর সন্তানের উত্তম শিক্ষাদান আবশ্যক করে দিয়েছেন। আর যে বিষয় অবশ্য পালনীয় তাতে কারো ইচ্ছা-অনিচ্ছার এখতিয়ার থাকে না। আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনরা! তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবারবর্গকে রক্ষা করো সেই আগুন থেকে, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর। তাতে নিয়োজিত আছে কঠোর স্বভাব, কঠিন হূদয় ফেরেশতারা। যারা আল্লাহর কোনো হুকুমে তাঁর অবাধ্যতা করে না এবং সেটাই করে যার নির্দেশ তাদের দেওয়া হয়।’ (সুরা : তাহরিম, আয়াত : ৬)
সন্তানের লালন-পালন, পরিপুষ্টি, সংরক্ষণ, পরিবৃদ্ধি—সর্বোপরি আদর্শ মানুষ হিসেবে তার জীবন গঠন করার দায়িত্ব মা-বাবার। উপার্জন, শাসন, নিয়ন্ত্রণ ও বহিরাঙ্গনের শ্রমসাধ্য দায়িত্ব পিতাকে পালন করতে হয়। অভ্যন্তরীণ কাজকর্ম, শিশুর লালন-পালন ও প্রাথমিক শিক্ষার মতো মৌলিক ও ধৈর্যসাধ্য কাজগুলো সাধারণত মায়ের ওপর বর্তায়। শিশু নির্দোষ প্রকৃতি নিয়ে পৃথিবীতে আসে। তাকে দৈহিক ও মানসিক প্রশিক্ষণ দিয়ে গড়ে তুলে উপযুক্ত নাগরিক করার দায়িত্বও মা-বাবার। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘প্রতিটি শিশুই ফিতরাত (সত্য গ্রহণের যোগ্যতা) নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। তারপর তার মা-বাবা তাকে ইহুদি, খ্রিস্টান অথবা অগ্নিপূজক বানায়।’ (বুখারি, হাদিস : ১৩৮৫; মুসলিম, হাদিস : ২৬৫৮)
ইমাম গাজালি (রহ.) বলেছেন, ‘সন্তান মাতা-পিতার কাছে আমানত। সন্তানের অন্তর একেবারে স্বচ্ছ। তাতে যেকোনো কিছু বপন করা যাবে। সন্তানকে ভালো কাজে অভ্যস্ত করলে মাতা-পিতা ইহকাল ও পরোকালে সুখী হবে। সন্তান মন্দ কাজে অভ্যস্ত হলে মাতা-পিতা পশুর মতো অবহেলিত হবে।’ (ইহইয়াউ উলুমিদ দিন, পৃষ্ঠা : ৭২/৩)
সন্তান বখে যাওয়ায় মা-বাবার দায় : মা-বাবা যদি সন্তানকে বাল্যকাল থেকেই উত্তম শিক্ষা-দীক্ষা না দেন, পরে পূর্ণবয়স্ক হওয়ার পর তার থেকে গোনাহ প্রকাশ হতে থাকে তাহলে মা-বাবা এর জন্য দায়ি হওয়া স্বাভাবিক। যেসব মা-বাবার সন্তান বখে যায়, তাঁরা আল্লাহর মহাপরীক্ষায় পড়ে আছেন। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘জেনে রেখো, তোমাদের সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তোমাদের জন্য পরীক্ষাস্বরূপ। (এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে) তোমাদের জন্য আল্লাহর কাছে মহাপুরস্কার আছে।’ (সুরা : আনফাল, আয়াত : ২৮)
কোনো কোনো সন্তানের মধ্যে লুকিয়ে আছে শত্রুর ছায়া : সন্তান বিপথগামী হলে তাদের দ্বারা মা-বাবা শত্রুর শত্রুতার চেয়েও বেশি কষ্ট পেতে পারেন। কোনো কোনো সন্তানের মধ্যে লুকিয়ে আছে শত্রুর ছায়া। মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে ঈমানদাররা! তোমাদের স্ত্রী-স্বামী ও সন্তান-সন্ততিদের মধ্যে কেউ কেউ তোমাদের শত্রু; অতএব তাদের সম্পর্কে তোমরা সতর্ক থেকো...।’ (সুরা : তাগাবুন, আয়াত : ১৪)
বখাটে সন্তান যোগ্য উত্তরাধিকার বিবেচিত হয় না : বিপথে যাওয়া সন্তান মা-বাবার মর্যাদা ও সম্পদ নিমেষেই ধূলিসাত্ করে দিতে পারে। এর পথ ধরে মূল সেই সন্তান যোগ্য উত্তরাধিকার বিবেচিত হয় না এবং আত্মীয়তার বলয় থেকে বেরিয়ে যায়। নুহ (আ.)-এর আমলে ঐতিহাসিক মহাপ্রলয়ের মাধ্যমে সে যুগের বিশ্বাসী ও অবিশ্বাসীদের মধ্যে চূড়ান্ত মীমাংসা হয়ে যায়। সে সময় নুহ (আ.)-এর পুত্র অবিশ্বাসীদের সঙ্গ ত্যাগ করতে অস্বীকৃতি জানায়। তাই সে পিতার ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক পারিবারিক বলয় থেকে বেরিয়ে যায়। আল্লাহ বলেন, ‘হে নুহ, সে তো তোমার পরিবারভুক্ত নয়। সে অবশ্যই অসত্কর্মপরায়ণ...।’ (সুরা : হুদ, আয়াত : ৪৬)
এমন বখে যাওয়া সন্তানকে কঠোর অনুশাসনের আওতায় আনার বিকল্প নেই।
অবাধ্য সন্তানকে সংশোধন করার পদ্ধতি : সৌদি আরবের স্থায়ী ফতোয়া কমিটির আলেমদের কাছে একজন বয়স্ক ব্যক্তি প্রশ্ন করেছিলেন—‘আমার দুটি যমজ ছেলে আছে। তারা অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে। আমি চাই, তারা দ্বিনদার ও সত্পথে চলুক এবং আমার সঙ্গে মসজিদে গিয়ে নামাজ আদায় করুক। কিন্তু কখনো কখনো তারা তা করতে অস্বীকার করে। আমি তাদের জন্য দোয়া চাই এবং জানতে চাই, তাদের সংশোধন করার কী উপায় আছে।’
আলেমরা জবাবে বলেন, আমরা আপনাকে উপদেশ দিচ্ছি, আপনি সন্তানদের নসিহত করা অব্যাহত রাখুন এবং নিরাশ হবেন না। তাদের শিক্ষা ও সংশোধনের জন্য কার্যকর পদ্ধতি অবলম্বন করুন। কখনো উত্সাহ দিয়ে, কখনো সতর্ক করে। তাদের অন্তরে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের ভালোবাসা সৃষ্টি করুন। অসত্ সঙ্গ থেকে তাদের দূরে রাখুন এবং সত্ লোকদের সঙ্গে মেলামেশায় উত্সাহিত করুন। যেসব গণমাধ্যম তাদের নৈতিকতা নষ্ট করে, সেগুলো থেকে সতর্ক করুন।
এসবের আগে ও পরে সর্বদা আল্লাহর কাছে তাদের সংশোধন ও সঠিক পথে চলার জন্য দোয়া করতে থাকুন।
এরপর তাঁরা আল্লাহ তাআলার এই বাণী উল্লেখ করেন—‘আর যারা বলে, ‘হে আমাদের রব! আমাদের স্ত্রীদের ও আমাদের সন্তানদের পক্ষ থেকে আমাদের চোখ জুড়িয়ে দাও এবং আমাদের মুত্তাকিদের নেতা বানিয়ে দাও।’ (সুরা আল-ফুরকান, আয়াত : ৭৪) (সূত্র : ফাতাওয়া আল-লাজনাহ আদ-দায়িমাহ, ২৫/২৮৮)
এ থেকে বোঝা যায়, সন্তানদের যত্ন নেওয়া, তাদের দ্বিনি শিক্ষা দেওয়া, তাদের ন্যায় ও ইনসাফ শিক্ষা দেওয়া, ভালো কাজে উত্সাহিত করা এবং মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করা বাবা-মায়ের দায়িত্ব। তবে অবাধ্য সন্তানকে সংশোধনের ক্ষেত্রে কোমলতা, ধৈর্য এবং বিভিন্ন কার্যকর পদ্ধতি অবলম্বন করতে হবে। সন্তান যত ভুলই করুক, তাকে সংশোধনের চেষ্টা সহজে ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়।
সন্তানের সংশোধনের জন্য কোরআনে বর্ণিত দোয়া : বখাটে সন্তানের সংশোধনের জন্য মহান আল্লাহর কাছে দোয়া করার বিকল্প নেই। সেক্ষেত্রে কোরআনে বর্ণিত এই দোয়া পাঠ করা যায়—‘হে আমার রব! আমাকে ও আমার মা-বাবাকে তুমি যে নিয়ামত দান করেছ, তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার শক্তি আমাকে দান করো এবং আমি যেন এমন সত্কর্ম করতে পারি, যা তুমি পছন্দ করো। আর আমার জন্য আমার সন্তান-সন্তুতিকে সংশোধন করে দাও। আমি তোমার দিকে ফিরে গেলাম আর আমি তো মুসলমানদের অন্তর্ভুক্ত।’ (সুরা আহকাফ, আয়াত : ১৫)
শহীদ