২২ আশ্বিন ১৪৩৩ , বৃহস্পতিবার   ০৮ অক্টোবর ২০২৬

চিতলমারীতে একই গ্রামের ৫টি পরিবারের মানবতার জীবনযাপন 

অরুণ কুমার সরকার, চিতলমারী, বাগেরহাট 

প্রকাশ: ১৬:৩৯,৬ অক্টোবর ২০২৬

চিতলমারীতে একই গ্রামের ৫টি পরিবারের মানবতার জীবনযাপন 

ছবি: নিউজমিশন২৪

সমাজের অবহেলিত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠি জেলে সম্প্রদায়ের অসহায় মানুষ সাবোখালী গ্রামের বিধবা কবিতা বিশ্বাস (৬৩)। তার বসতঘরটির কোথাও জাল, কোথাও পরিত্যাক্ত বস্তা কিংবা কাপড়-চোপড় দিয়ে সম্ভ্রম রক্ষার মতো ঢেকেঢুকে রাখার অবিরাম চেষ্টা করেন। ঘরে একমাত্র ছেলে সমীর বিশ্বাস অসুস্থ। সরকারের তালিকাভুক্ত মৎস্যজীবি এবং যাত্রা উন্নয়ন শিল্পী সমিতির সদস্য। এলাকায় যাত্রা অভিনেতা হিসেবে সমীরের সুনাম রয়েছে। কিন্তু তার সকল সুনাম ফিকে হয়ে যায়, যখন জরাজীর্ণ বসতঘরে শুয়ে ভাঙাচোরা চালের ফাঁক দিয়ে আকাশ দেখেন আর বৌয়ের মুখ ঝাম্টি খেতে হয়। সংসারে আয়ের একমাত্র লোক সমীর বিশ্বাস বলেন, নদী-খালে এখন আর আগের মতো মাছ জোটানো যায়না। মাঝেমধ্যে লোকে ডাকলে দিনমজুরিতে গেলে দিনে পাঁচশত টাকা পাই। তাতে কী আর সংসার চলে? তার উপর এখন অসুস্থায় কাহিল। বসতঘরটি ঠিকঠাক করার টাকা নেই। তাই পলিথিন, এটা-ওটা দিয়ে সামলে রাখার চেষ্টা করি। কিন্তু মুষলধারে বৃষ্টি হলে সব বেসে যায়। তখন প্রতিবেশিদেও বাড়ি ঠাঁই নিতে হয়। ঘরটি সংস্কারের জন্য সরকার সহ সকলের সাহায্য দরকার।    

সেলাই মেশিনে কাজ করছিলেন কমলা সরকার। তার জরাজীর্ণ চালের নিচ থেকে আকাশ দেখা যায়। পুরনো জংধরা অসংখ্য ফুটোওয়ালা টিনগুলো ঝাঝরা হয়ে ঝরে ঝরে পড়ছে। তা ঠেকাতে টানিয়েছে অনেক পলিথিন। চিতলমারী সদর ইউনিয়নের সাবোখালী মধ্যপাড়া গ্রামের বাসিন্দা কমলা সরকার সাবোখালী-কাটাখাল মাইক্রোওয়াটার সেড সমিতির সদস্য। সরকারি বসতঘরের জন্য ছুটেছে নানা দ্বারে। ইউএনওর কাছে আবেদনও করেছে। কিন্তু নতুন বসতঘর পাওয়া তো স্বপ্নের ব্যাপার- জোটাতে পারেনি জরাজীর্ণ বসতঘরটির জন্য ছাউনির টিন কিংবা মিস্ত্রির খরচাপাতি। 

কমলা সরকারের স্বামী বিকাশ সরকার সাধারণ একজন টেলিভিশন মেরামতকারী। এখন টিভি দেখার প্রচলন কমে গেছে। তাই তার আয়ে ঠিকমতো চাল-ডাল যোগাড় করাই কষ্টকর। তার উপর দুই ছেলের লেখাপড়ার প্রাইভেটসহ অন্যান্য খরচা আছে। তা ঠিকমতো যোগাড় হয়না। বড় ছেলেটি শেরেবাংলা ডিগ্রি কলেজের বিএ শিক্ষার্থী এবং ছোট ছেলে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে। তিনি বলেন, বসতঘরের জন্য প্রয়োজনীয় টিন ও মেরামতের খরচ যোগাড় করতে পারলে বাঁচতে পারতাম। আর ছেলেদের লেখাপড়ার জন্য প্রাইভেটের খরচা হলে ওরা ভালো ফলাফল করতে পারতো। কমলা সরকার বলেন, ‘খাই বা না-খাই, সন্তানদের লেখাপড়া শেখাতে চাই! তাই দিনরাত মেশিনে সেলাইয়ের কাজ করি। কিন্তু গ্রামের লোকেরা উপযুক্ত পারিশ্রমিক দিতে পারেনা। এই অবস্থায় সরকার সহ সকলের কাছে সাহায্য কামনা করি। ’’

অপরদিকে, সাবোখালী পাউবোর ওয়াপদা বাধের পাশে জরাজীর্ণ বসতঘরে মানবেতর জীবনযাপন করছেন ভূমিহীন উন্নতি ঢালী (৬২)। চিতলমারী সদর ইউনিয়নের ৭নং ওয়ার্ডের প্রহ্লাদ ঢালীর স্ত্রী উন্নতি ঢালী মঙ্গলবার (০৬ অক্টোবর, ২০২৬) সরেজনিকালে এই প্রতিবেদককে জানান, সীমাহীন কষ্টে এই ওয়াপদার জয়গায় তারা অন্তত ৫০ বছর ধরে বসবাস করলেও তাদের কপালে জোটেনি সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্পের কোন বসতঘর। ভাঙাচোরা, খুটি নড়বড়ে ঘরটি যেকোন সময় ভেঙে পড়ে তাদেও মৃত্যু হতে পারে। তাদের দুই ছেলের মধ্যে একজন প্রায় ছয় মাস আগে দেনার দায়ে এলাকা ছেড়ে নিরুদ্দেশ হয়েছে। এখন বয়োবৃদ্ধ স্বামী-স্ত্রী আরেক ছেলেকে নিয়ে মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ ওই ঘরে বসবাস করতে বাধ্য হচ্ছেন। দিনমজুর ছেলেটির আয়ে প্রতিদিনের খাবার যোগাড় করাই কষ্টকর। বসতঘর সংস্কার করবেন কিভাবে ? নিজেদের অসহায়তার কথা প্রকাশ করে তারা সরকার সহ সমাজসেবীদের সহায়তা কামনা করেন।   

কমলা সরকার, উন্নতি ঢালী কিংবা বিধবা কবিতা বিশ্বাসের মতো জরাজীর্ণ বসতঘরে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস করছেন মো. ইয়াসিনের স্ত্রী লাকি, যতীশ বাড়ৈয়ের ছেলে অসুস্থ দিনমজুর বাসুদেব বাড়ৈ (৬৫)। এই পাঁটি অসহায় দরিদ্র পরিবারের বসতঘরগুলো সংস্কারের জন্য সরকারী সাহায্যের পাশাপাশি সমাজসেবীদেও এগিয়ে আসার আহবান জানান এলাকাবাসী। 

স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধা অরুণ চন্দ্র বিশ্বাস অসহায় পরিবারগুলোর চরম মানবেতরভাবে জীবনযাপনের অবস্থা দেখে কান্নাজড়িতভাবে বলেন, মানুষ হিসেবে প্রত্যেক নাগরিকের নিরাপদ বাসস্থান সহ সকল মৌলিক চাহিদা পূরণের জন্য সরকার বদ্ধপরিকর। তাই সরকারি টিন সহ অন্যান্য সহায়তার মাধ্যমে পরিবারগুলোর বসতঘর সংস্কারের উদ্যোগ নিলে দরিদ্র মানুষগুলোর উপকার হবে। পাশাপাশি এই সরকারেরও সুনাম বাড়বে। 

স্থানীয় ০৭নং ওয়ার্ডেও সাবেক ইউপি সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা সুনীল কুমার রায় বলেন, দরিদ্র অসহায় ওই পাঁচটি পরিবারের মানবিক দিক বিবেচনা করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা যদি সরকারি টিন ও মিস্ত্রী খরচের ব্যবস্থা করেন তাহলে খুব উপকার হবে।

এই বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খাদিজা আক্তার জানান, ক্ষতিগ্রস্থরা লিখিতভাবে আবেদন করলে খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যস্থা নেয়া হবে।         

শহীদ

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন

শীর্ষ সংবাদ: