২০০৫ থেকে ২০২৬: আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির সেরা ১০ মুহূর্ত
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ২০:০৪,৭ অক্টোবর ২০২৬
ছবি: সংগৃহীত
২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট। হাঙ্গেরির বিপক্ষে বদলি হিসেবে মাঠে নেমে মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন ১৮ বছরের এক তরুণ। সেই অস্বস্তিকর অভিষেক থেকেই শুরু হয়েছিল লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা অধ্যায়। ২১ বছর পর ২০২৬ সালে সেই অধ্যায়ের শেষ হয় বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা, অসংখ্য গোল আর অবিশ্বাস্য সব পারফরম্যান্স উপহার দিয়ে। আর্জেন্টিনার জার্সিতে লিওনেল মেসির গল্প যেন ফুটবল রূপকথারই আরেক নাম।
মেসি এখন আর আর্জেন্টিনার জাতীয় দলের খেলোয়াড় নন। বুধবার (৭ অক্টোবর) বেনিনের বিপক্ষে ৩-০ ব্যবধানের জয়ে শেষ হয়েছে তার ২১ বছরের আন্তর্জাতিক অধ্যায়। বিদায়ী ম্যাচেও একটি গোল ও দুটি অ্যাসিস্ট করে নিজের শেষ রাতটিকেও করে নিয়েছেন স্মরণীয়। আর্জেন্টিনার হয়ে ২০৮ ম্যাচে ১২৬ গোল করে সর্বোচ্চ গোলদাতা ও সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলা খেলোয়াড় হিসেবে বিদায় নিয়েছেন তিনি।
কিন্তু মেসির আর্জেন্টিনা অধ্যায়কে কেবল সংখ্যা দিয়ে মাপা যায় না। কত শত গোলের মধ্যেও কিছু মুহূর্ত আছে, যেগুলো আলাদা করে মনে থাকবে যুগের পর যুগ। সেগুলোর মধ্যে সেরা ১০টি:
১. ২০০৬ বিশ্বকাপে প্রথম ঝলক
২০০৬ বিশ্বকাপে সার্বিয়ার বিপক্ষে মাঠে নামার সময় মেসির বয়স ছিল মাত্র ১৮। মাত্র ১৬ মিনিটের সেই উপস্থিতিতেই গোল করেন এবং আরেকটি গোলে সহায়তা করেন। বিশ্বমঞ্চে নিজের আগমনী বার্তাটা সেদিনই দিয়ে দিয়েছিলেন আর্জেন্টাইন জাদুকর।
২. ব্রাজিলের বিপক্ষে সেই হ্যাটট্রিক
২০১২ সালে ব্রাজিলের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচ হলেও মেসির পারফরম্যান্সটি ছিল প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচের চেয়েও বেশি তীব্র। ৪-৩ ব্যবধানের জয়ে তিন গোল করেন তিনি। বিশেষ করে শেষ গোলটি। মাঝমাঠ থেকে বল নিয়ে এগিয়ে গিয়ে দূরপাল্লার নিখুঁত শট, আজও তার ক্যারিয়ারের অন্যতম স্মরণীয় গোল।
৩. ইকুয়েডরের বিপক্ষে একার হাতে বিশ্বকাপ নিশ্চিত
২০১৮ বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে আর্জেন্টিনা তখন বিপদে। রাশিয়া বিশ্বকাপে জায়গা পেতে জয়ের বিকল্প ছিল না। কুইটোর উচ্চতায় ইকুয়েডরের বিপক্ষে মেসি করলেন হ্যাটট্রিক। শুরুতেই গোল হজম করেও আর্জেন্টিনাকে ৩-১ ব্যবধানের জয় এনে সরাসরি বিশ্বকাপের টিকিট পাইয়ে দেন অধিনায়ক।
৪. দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান: কোপা আমেরিকা ২০২১
আর্জেন্টিনার হয়ে একের পর এক ফাইনালে হার। সমালোচনা, হতাশা, এমনকি জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণাও দিয়েছিলেন মেসি। কিন্তু ২০২১ কোপা আমেরিকার ফাইনালে ব্রাজিলকে হারিয়ে অবশেষে পেলেন বহু কাঙ্ক্ষিত বড় আন্তর্জাতিক শিরোপা। ম্যাচে গোল না পেলেও পুরো টুর্নামেন্টে তার অবদান ছিল অসাধারণ। শেষ বাঁশির পর কান্নায় ভেঙে পড়া মেসির ছবি হয়ে ওঠে আর্জেন্টিনার ফুটবলের অন্যতম প্রতীক।
৫. সৌদি আরবের ধাক্কার পর মেক্সিকোর বিপক্ষে জাদু
২০২২ কাতার বিশ্বকাপ শুরু হয়েছিল সৌদি আরবের কাছে অপ্রত্যাশিত হারে। ফলে মেক্সিকোর বিপক্ষে ম্যাচটি হয়ে উঠেছিল বাঁচা-মরার লড়াই। ৬৪ মিনিটে আনহেল দি মারিয়ার পাস নিয়ন্ত্রণ করে প্রায় ২৫ গজ দূর থেকে নিচু শটে গোল করেন মেসি। সেই গোলের পরই যেন বদলে যায় আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপের গল্প।
৬. ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে গভার্দিওলকে ছিটকে দেয়া
২০২২ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে জোস্কো গভার্দিওল তখন টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা তরুণ ডিফেন্ডার। কিন্তু মেসির সামনে সেদিন তার সব প্রতিরোধ ভেঙে পড়ে। ডানপ্রান্তে গভার্দিওলকে বারবার পরাস্ত করে মেসি জুলিয়ান আলভারেজকে গোলের সুযোগ তৈরি করে দেন। আর্জেন্টিনার ৩-০ জয়ে সেই মুহূর্তটি ছিল মেসির ব্যক্তিগত জাদুর আরেক প্রদর্শন।
৭. ব্যাটল অব লুসাইল
নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ২০২২ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল ছিল উত্তেজনা আর নাটকে ভরা। মেসির অসাধারণ পাসে নাহুয়েল মোলিনা গোল করেন, পরে পেনাল্টি থেকে নিজেও গোল করেন। ম্যাচ টাইব্রেকারে জিতে সেমিফাইনালে ওঠে আর্জেন্টিনা। তবে ম্যাচের পর ওয়াউট ভেঘর্স্টকে উদ্দেশ করে মেসির উত্তপ্ত মন্তব্যও হয়ে যায় সেই রাতের আলোচিত স্মৃতি।
৮. অবশেষে বিশ্বকাপ: ১৮ ডিসেম্বর ২০২২
এটাই মেসির আর্জেন্টিনা ক্যারিয়ারের মুকুট। ফ্রান্সের বিপক্ষে ফাইনালে জোড়া গোল, টাইব্রেকারে জয় এবং হাতে বিশ্বকাপ। ৩৫ বছর বয়সে পুরো টুর্নামেন্টে এমন আধিপত্য দেখান যে গোল্ডেন বলও ওঠে তার হাতে। নকআউট পর্বের প্রতিটি ম্যাচে ম্যাচসেরা হয়ে বিশ্বকাপ জেতা মেসির গল্পকে নিয়ে যায় অন্য উচ্চতায়।
৯. ২০২৬ বিশ্বকাপে আরেকবার অসম্ভবকে সম্ভব করার চেষ্টা
ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপেও থামেননি মেসি। উত্তর আমেরিকার বিশ্বকাপে ৩৯ বছর বয়সে আট গোল ও চার অ্যাসিস্ট করে আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে তুলেছিলেন। বয়সের ভারকে উপেক্ষা করে আবারও প্রমাণ করেছিলেন, বড় মঞ্চে তার জাদু শেষ হয়ে যায়নি। ফাইনালে স্পেনের কাছে হারলেও শেষ বিশ্বকাপটিও নিজের ছাপ রেখেই শেষ করেন তিনি।
১০. শেষ রাতেও অনবদ্য মেসি
সব গল্পের শেষটা হয়তো এমনই হওয়া উচিত ছিল। ২০২৬ সালের ৭ অক্টোবর মনুমেন্টালে বেনিনের বিপক্ষে শেষবার আর্জেন্টিনার জার্সি পরলেন মেসি। ম্যাচে একটি গোল করলেন, বানিয়ে দিলেন আরও দুটি। ৩-০ ব্যবধানের জয়ের পর চোখের জলে বিদায় নিলেন জাতীয় দল থেকে। ২১ বছরের আন্তর্জাতিক অধ্যায়ের শেষ দৃশ্যটিও হয়ে থাকল মেসির মতোই–গোল, অ্যাসিস্ট, জয় আর অশ্রুসিক্ত বিদায়।
মেসির আর্জেন্টিনা অধ্যায় শেষ হয়েছে, কিন্তু তার রেখে যাওয়া গল্পের শেষ নেই। ২০০৬-এর সেই ১৮ বছরের কিশোর থেকে ২০২২-এর বিশ্বচ্যাম্পিয়ন অধিনায়ক; পথটা ছিল ব্যর্থতা, কান্না, সমালোচনা, প্রত্যাবর্তন ও শেষ পর্যন্ত পূর্ণতার। একসময় আর্জেন্টিনার হয়ে শিরোপা জিততে না পারার দায়ে যিনি প্রশ্নের মুখে পড়তেন, সেই মেসিই শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ, দুটি কোপা আমেরিকা ও ফাইনালিসিমার মতো বড় শিরোপা এনে বিদায় নিলেন।
বেনিন ম্যাচের পর ৮৫ হাজারের বেশি দর্শকের সামনে অশ্রুসিক্ত মেসির বিদায় তাই নিছক একজন ফুটবলারের অবসর নয়। এটি একটি যুগের সমাপ্তি। যে যুগে আর্জেন্টিনার নীল-সাদা জার্সি আর ১০ নম্বর মানেই ছিল মেসি।
শহীদ