৪ ঘন্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে
টঙ্গীতে ওষুধ কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড
রৌদ্র মুশফিক, গাজীপুর
প্রকাশ: ২২:৩২,১৪ অক্টোবর ২০২৬
ছবি: নিউজমিশন২৪
গাজীপুরের টঙ্গীতে ওষুধ কারখানা ড্রাগ ইন্টারন্যাশনাল কোম্পানি লিমিটেডের (ইউনিট-২) কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় ফায়ার সার্ভিসের ২০ টি ইউনিট প্রায় ৪ ঘন্টা চেষ্টার পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। তবে আগুন পুরোপুরি নেভাতে সন্ধ্যার পর পর্যন্ত ড্যাম্পিংয়ের কজ করছিল তারা। বুধবার মহানগরীর টঙ্গী চেরাগ আলী এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
বুধবার দুপুর ২টা ১০ মিনিটে ঘটনাস্থলে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে এ তথ্য জানান ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক (ডিজি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন জুনাইদ।
প্রাথমিকভাবে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বুধবার সকাল ১০ টার দিকে ড্রাগ ইন্টারন্যাশনালের একটি ভবনে আগুন লাগে। পরে আগুন পাশের পেনসিলিং ভবনের চারতলায় ছড়িয়ে পড়ে ভয়াবহ আকার ধারণ করে। মুহূর্তেই আগুনের লেলিহান শিখা ভবনে ছড়িয়ে পড়লে পুরো এলাকায় আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। কারখানার ভেতরে ওষুধ, কেমিক্যাল, ধাতব পদার্থ, উৎপাদনসংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতি ও বিভিন্ন শিল্পসামগ্রী থাকায় আগুনের বিস্তার ও ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা বেড়েছে। আগুনের তীব্রতা এতটাই বেশি যে কারখানার ভেতরে থাকা বিভিন্ন মালামাল পুড়ে যাচ্ছে। আগুনের প্রচণ্ড তাপ, ঘন ধোঁয়া ও কেমিক্যালের তীব্র গন্ধে আশপাশে অবস্থান করাও কঠিন হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা বিভিন্ন দিক থেকে আগুন নেভানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
অগ্নিকাণ্ডের খবর পাওয়ার পরপরই ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নেভানোর কাজ শুরু করেন। আগুনের ব্যাপকতা বাড়তে থাকায় পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন স্টেশন থেকে অতিরিক্ত ইউনিট আনা হয়। কারখানার ভেতরে কেমিক্যাল ও বিভিন্ন উপকরণ থাকায় অগ্নিনির্বাপণ কার্যক্রম আরও জটিল হয়ে উঠেছে বলে ঘটনাস্থল থেকে জানা গেছে। আগুনের তীব্র তাপ ও কেমিক্যালের গন্ধে আশপাশের পরিবেশ অস্বস্তিকর হয়ে পড়েছে। আগুনের কারণে কী ধরনের রাসায়নিক ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, তা এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এ অবস্থায় ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের আগুন নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি সম্ভাব্য ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে। আগুন যাতে পাশের ভবন ও আশপাশের অন্যান্য স্থাপনায় আরও ছড়িয়ে না পড়ে, সে জন্যও চেষ্টা চালানো হচ্ছে।
এদিকে, আগুন লাগার পরপরই কারখানার ভেতরে থাকা পানির ব্যবহার করে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করা হয়। তবে একপর্যায়ে পানির সংকট দেখা দেয়। এ পরিস্থিতিতে আশপাশের এলাকা থেকে পানিবাহী গাড়ির মাধ্যমে পানি সরবরাহ করে অগ্নিনির্বাপণ কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়া হচ্ছে। প্রচণ্ড তাপ, ঘন ধোঁয়া ও কেমিক্যালের গন্ধের কারণে আগুনের উৎস শনাক্ত করা এবং ভবনের ভেতরে প্রবেশ করে কাজ করা ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। পরে গাজীপুর, টঙ্গী, উত্তরা ও আশপাশের বিভিন্ন স্থান থেকে পানিবাহী গাড়ি এনে আগুন নেভানোর কাজে সহায়তা নেওয়া হচ্ছে।
গাজীপুর ফায়ার সার্ভিসের উপ-পরিচালক সাইদুল আলম চৌধুরী জানান, সকাল ১০টার দিকে কারখানাটিতে আগুন লাগার খবর পেয়ে প্রথমে টঙ্গী ফায়ার সার্ভিসের ৩টি ইউনিট তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থলে গিয়ে কাজ শুরু করে। পরে আগুনের ভয়াবহতা বাড়লে আশপাশের আরও ৫টি এবং সবশেষ আরও ৬টি ইউনিট যুক্ত হয়ে মোট ১৪টি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণের কাজে যোগ দেয়। পরিস্থিতি বিবেচনায় বাড়ানো হয় ফায়ার সার্ভিসের ইউনিটসংখ্যা। পরবর্তীতে গাজীপুর ও ঢাকাসহ আশপাশের আরও কয়েকটি ইউনিট এসে তারা একযোগে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে।
কারখানাটিতে আগুন লাগার পর আশপাশের এলাকায় উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। তবে আগুনের সূত্রপাত, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এবং হতাহতের বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনও তথ্য পাওয়া যায়নি। আগুনের তীব্রতা বেশি হওয়ায় এবং প্রচণ্ড তাপ, ঘন ধোঁয়া ও কেমিক্যালের গন্ধের কারণে ভবনের ভেতরে প্রবেশ করে কাজ করতে ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেছেন ফায়ার ফাইটাররা। আগুনের উৎস শনাক্ত করা এবং ভেতরের আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে তারা ভবনের ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করছেন। পরে আগুন পাশের চারতলা একটি ভবনেও ছড়িয়ে পড়ে। কারখানাটির ভেতরে ওষুধ, উৎপাদনসংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতি, কেমিক্যাল, ধাতব যন্ত্রাংশ ও অন্যান্য শিল্পসামগ্রী রয়েছে। আগুনের কারণে এসব মালামাল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। তবে ঠিক কত পরিমাণ মালামাল পুড়েছে এবং আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ কত, তা এখনও নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি। আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসার পর ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র জানা যেতে পারে।
ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক (ডিজি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন জুনাইদ বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে জরুরি ভিত্তিতে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করা হয়। ফায়ার সার্ভিসের ২০টি ইউনিটের চেষ্টায় সাড়ে ৩ ঘন্টা পর (দুপুর ১টা ৫৫ মিনিটে) আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে আগুন পুরোপুরি নেভাতে আরও সময় লাগবে।
তিনি জানান, কারখানার সাততলা ভবনের চতুর্থ ও দ্বিতীয় তলায় আগুন লাগে। ইনজেকশনসহ জরুরি ওষুধে আগুন লাগায় শ্বাসকষ্টের সমস্যা তৈরি হয়। এ ঘটনায় কোনও হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। তবে ফায়ার সার্ভিসের একজন কর্মী শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত হয়েছেন। তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
কারখানাটি টঙ্গী শিল্প এলাকার স্কুইব রোডে অবস্থিত। কারখানার ইউনিট-২-এর সাততলা ভবনের চতুর্থ তলায় আগুনের সূত্রপাত হয়। প্রথমে কারখানার নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় আগুন নেভানোর চেষ্টা করেন কর্মীরা। কিন্তু আগুনের তীব্রতা বাড়তে থাকায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। পরে ফায়ার সার্ভিসকে খবর দেওয়া হয়। খবর পেয়ে টঙ্গী, সাভার, গাজীপুর, আশুলিয়া ও ঢাকা থেকে ফায়ার সার্ভিসের ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। আগুন নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের পাশাপাশি সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ ও গাজীপুর সিটি করপোরেশনের সদস্যরা কাজ করেন। আগুনের ঘটনায় কারখানার আশপাশের প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকায় গণপরিবহন চলাচল ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়। কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। কোম্পানির কর্তৃপক্ষের সহায়তায় ভবনের ভেতরে থাকা সবাইকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ভবনের ভেতরে কোনো কর্মী নেই। আগুন পুরোপুরি নিভিয়ে ফেলার পরই আমরা নিশ্চিত করে বলতে পারবো যে ভেতরে কেউ হতাহত হয়েছেন কি না।
ফায়ার সার্ভিসের এই কর্মকর্তা জানান, চারতলা ভবনের তৃতীয় তলা থেকে আগুনের সূত্রপাত হয় এবং পরবর্তীতে তা পাশের আরেকটি ভবনে ছড়িয়ে পড়ে। আগুন লাগার কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত চলছে। কারখানাটিতে আগুনের সূত্রপাত কীভাবে হয়েছে, তা এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বৈদ্যুতিক ত্রুটি, যন্ত্রপাতির সমস্যা কিংবা অন্য কোনও কারণে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে জানা যাবে। আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পর কারখানার ক্ষয়ক্ষতি, হতাহত ও অগ্নিকাণ্ডের কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানা যেতে পারে। ওষুধ তৈরির রাসায়নিক ও অন্যান্য দাহ্য পদার্থ থাকায় আগুন নেভানোর কাজে নিয়োজিত উদ্ধারকর্মীদের শ্বাস নিতে বেশ কষ্ট হচ্ছে। ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ব্রিদিং অ্যাপারেটাস ব্যবহার করে কাজ করছেন।
ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা গেছে, আগুন নিয়ন্ত্রণে টঙ্গী ফায়ার স্টেশন থেকে তিনটি, উত্তরা থেকে তিনটি, গাজীপুর চৌরাস্তা মডার্ন ফায়ার স্টেশন থেকে চারটি, কুর্মিটোলা থেকে চারটি, রাজেন্দ্রপুর থেকে দুটি এবং পূর্বাচল থেকে তিনটি ইউনিট পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া আগুন নিয়ন্ত্রণের কাজে যুক্ত হয়েছে মিরপুর থেকে পাঠানো একটি হ্যাজম্যাট টেন্ডার।আগুনের তীব্রতা বাড়তে থাকায় তা নিয়ন্ত্রণে আনতে ফায়ার সার্ভিসের ২০টি ইউনিট কাজ করছে। তাদের সঙ্গে আগুন নেভানোর কাজে যোগ দিয়েছেন সেনাবাহিনী, বিজিবি ও পুলিশ সদস্যরা। সব মিলিয়ে ফায়ার সার্ভিসের ২০টি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করেছে। পাশাপাশি সেনাবাহিনী, বিজিবি ও পুলিশ সদস্যরা উদ্ধার ও অগ্নিনির্বাপণ কার্যক্রমে সহায়তা করছেন।
ড্রাগ ইন্টারন্যাশনালের ব্যবস্থাপক শফিকুল ইসলাম বাদল বলেন, কারখানার নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে আগুনের তীব্রতার কারণে পরিস্থিতি সামাল দিতে ফায়ার সার্ভিসসহ সংশ্লিষ্ট বাহিনীর সহায়তা নিতে হয়।
গাজীপুরের জেলা প্রশাসক (ডিসি) নূুরুল করিম ভূঁইয়া বলেন, আমরা চেষ্টা করেছি ড্রাগ ইন্টারন্যাশনাল কারখানায় লাগা ভয়াবহ আগুন ফায়ার সার্ভিসের জনবল দিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রন করার জন্য। এখানে আগুন লাগার সাথে সাথে সরকারের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সাহসী কর্মকর্তাদের পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যরা অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন। জেলা প্রশাসক হিসেবে আমি ফায়ার সার্ভিস, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, স্থানীয় প্রশাসনসহ যারা এ দু:সময়ে এগিয়ে এসছেন এবং মানুষের জীবন রক্ষা করার জন্য কাজ করেছেন তাদেরকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই।
শহীদ