যে চিঠি কখনো পড়েনি দেবী
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ০১:১৪,১ অক্টোবর ২০২৬
ছবি: প্রতীকী
আশা করছি ভালো ও সুস্থ আছো। যদিও ভালো থাকাটা কেবলই সংজ্ঞায়। নির্জনতা ও একাকীত্বে আমরা কেউ ভালো নেই। প্রত্যেকেরই একেকটা বিশাল দুঃখের সমুদ্র আছে। সেই সমুদ্রের পরিধি এতটাই সীমানাহীন যে বর্ণনা করাও অসাধ্য। চাঁদের ঝলমলে আলো যখনই আমাদের নিজস্ব দুঃখের সমুদ্রে প্রতিফলিত হয়, তখনই আমরা পূর্বের থেকে আরও বেশি ভালো থাকার অভিনয় করি। তুমি সাহিত্যের শিক্ষার্থী, এই মেটাফোর আরও ভালো বোঝো!
এমন সমুদ্র আমারও আছে। যখন পঞ্চমীর চাঁদের আলো আমার এই সমুদ্রে প্রতিফলিত হয়, তখন আমি দিকভ্রান্ত হয়ে যাই। ছন্দপতন ঘটে। মাঝসমুদ্রে দিক হারানো নাবিকের মতো উদভ্রান্ত হয়ে ভালো থাকার সন্ধান করি। তখন কেবলই মনে হয় ‘আমার হারানোর কিছুই নেই, তবুও বুঝি নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছি’। এই সময়গুলোতে প্রচুর গান শুনি, কবিতা ও সাহিত্য পড়ি, সিনেমা দেখি, ভ্রমণ করি এবং তোমাকে লিখি।
খেয়াল করে দেখেছি, তোমাকে লিখতে বসলেই আমার সমস্ত ক্লান্তি, গ্লানিকর অনুশোচনা ও অপ্রকাশিত দুঃখের ঢেউ বিলীন হয়ে যায়। অনিন্দ্য সুন্দর সুর ভেসে ওঠে হৃদয়ে। বারংবার তীব্র বাসনায় তোমায় দেখতে ইচ্ছে করে; নয়নাভিরাম গোল গোল দুটি চোখের ভাষা বুঝতে ইচ্ছে করে। ফলে আমার সব অস্থায়ী চিন্তা, অতিরিক্ত ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং ব্যর্থতার অগ্রিম দুশ্চিন্তা ও নানান ভাবনার অস্থিরতা নিমিষেই দূর হয়ে যায়।
তোমাকে নিয়ে চিন্তাগুলো আমার মনে গভীর কাব্যিক অনুপ্রেরণা সৃষ্টি করে। তোমার ব্যক্তিত্বের প্রতিটা দিক যেন এক একটি চিন্তামূলক শব্দচয়ন, যার সারমর্ম আমার আবেগের সমুদ্রে ঢেউ তোলে। কতটা পথ হাঁটলে একজন মানুষ সত্যিকারের পথিক হয়, তা আমি জানি না। তবে এইটুকু বলতে চাই, বহু মানুষের ভিড়ে আমি সবসময় তোমার সঙ্গ কামনা করি যে সঙ্গ কেবল হাতে হাত রেখে পথ চলায় নয়, বরং মননশীল আদান-প্রদানে সমৃদ্ধ হয়।
ইচ্ছে হয়, শান্ত, মনোরম পরিবেশে তোমার সঙ্গে কিছুক্ষণ বসি। তোমার প্রাণবন্ত হাসিতে চারপাশ মুখরিত হয়ে উঠলে সেই মুহূর্তগুলি যেন আরও রঙিন হয়ে ওঠে। হাজারো গুণের মাঝে তোমার ভেতরের আলোটাই আমার কাছে সবচেয়ে বেশি উজ্জ্বল মনে হয়, যে আলোটা দেখার জন্য মনের গভীর দৃষ্টি প্রয়োজন।
এমন আন্তরিক মুগ্ধতা নিয়ে কে না মেতে থাকতে চায়?
আমি চাই, এবং এই মুগ্ধতা চিরকাল বজায় থাকুক!
কারণ, তুমি আমার অর্ধেক আনন্দ, অর্ধেক বেদনা।
অর্ধেক কষ্ট, অর্ধেক সুখ। অর্ধেক নারী, অর্ধেক ঈশ্বরী!
অবশ্য গত রাতে তোমাকে নিয়ে একটা অদ্ভুত স্বপ্ন দেখেছি। স্বপ্ন যে মানুষের মনোজগতে কী পরিমাণ প্রভাব ফেলে সেটা আন্দাজ করতে পারছি। আফসোস হচ্ছে এবং একইসঙ্গে অভিমানও হচ্ছে। স্বপ্নের যদি বাস্তব অস্তিত্ব থাকত। বিখ্যাত মনোবিজ্ঞানী কার্ল জুং-এর কালেক্টিভ আনকনসাস তত্ত্ব অনুযায়ী, মানবমন একটি সার্বজনীন স্তরে সংযুক্ত। অনেক সময় কাছের মানুষদের অবচেতন মন একই ধরনের আবেগে প্রভাবিত হলে, তারা আমার মতো প্রতীকী স্বপ্ন দেখতে পারেন।
কিন্তু তোমার মনে অবচেতনভাবে আমার জন্য কী ধরনের আবেগ উদ্বেলিত হয় সেটা আমার জানার কথা না। আমাদের মধ্যে ল অব অ্যাট্রাকশনে অনেক মিল থাকলেও আমরা দুজনই দুই মেরুর মানুষ। আমাদের দেখা হয় না, ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা হয় না, কিন্তু আমাদের চিন্তা এক, হাসির ছন্দ এক, দুজনই শান্তি প্রিয় মানুষ, দুজনই বিনয়ী কাউকে কষ্ট দিতে জানি না। আমাদের হাসির আড়ালে অনেক অভিযোগ থাকলেও আমরা সেটা প্রকাশ করি না। আমরা জীবনের সমস্ত কিছু মেনে নিয়ে দিব্যি হাসিমুখ নিয়ে চলি যেন কিছুই হয়নি। কিছুই হওয়ার নয়। আমরা মানুষকে ভালোবাসাতে জানি কারণে-অকারণে। স্বার্থপরতার কোনো স্থান নেই আমাদের মধ্যে। নিজের স্বার্থের জন্য আমরা কিছুই করি না। মানুষকে যতটা প্রশান্তি দেওয়া যায়, যতটা উপকার করা যায় সেভাবেই করি।
এদিকে আমার ফুল ভালো লাগে, বাগান ভালো লাগে, প্রকৃতি ভালো লাগে, নির্জনতা ভালো লাগে, আঁকতে ভালো লাগে, সাহিত্য ভালো লাগে, রবীন্দ্রনাথের গান ভালো লাগে, বই পড়তে ভালো লাগে, নতুন কিছু সৃষ্টি করতে ভালো লাগে, ভালো লাগে যখন তুমি লাল শাড়ি পরে চোখে কাজল দিয়ে, কপালে টিপ দাও।
আরো ভালো লাগে যখন তুমি প্রাণ খুলে হাসো, মনে হয় যেন আমি হাসছি, তখন তোমার মধ্যে আমি নিজেকে খুঁজে পাই। আবার মনে হয় শাড়ি, ব্লাউজ, কাজল পরলে কী আমাকে তোমার মতো লাগবে? তোমাকে দিয়ে কী আমাকে বদল করা যাবে? এসব ভেবে আনমনে হাসি। কী সব উদ্ভট চিন্তা মাথায় ঘুরপাক খায়।
মাঝে মধ্যে ক্রিস্টোফার নোলানের ‘ইনসেপশন’ মতো তোমার স্বপ্নে ভেতরে ঢুকে আদ্যোপান্ত জানতে ইচ্ছেও করে। কানাডার কুইন্স ইউনিভার্সিটির গবেষকদের একটি আধুনিক গবেষণায় জানা গেছে, একজন মানুষ জেগে থাকার সময় মোট ৬,২০০টিরও বেশি নতুন বিষয় নিয়ে চিন্তা করে। তোমার এতোগুলো চিন্তার মধ্যে কী আমি থাকি?
থাকতেই হবে এমন না, জানতে চাচ্ছি কারণ তোমাকে নিয়ে আমি স্বপ্ন দেখছি। অসাধারণ সব স্বপ্ন। মানুষ তখনই স্বপ্ন দেখে যখন কোনো বিষয় নিয়ে নিবিড়ভাবে মগ্ন থাকে। যখন দুটো মানুষ একই সব তথ্য চিন্তা করে। আমি জানি না এটাকে টেলিপ্যাথিক যোগাযোগ বলে কী না৷ এটাও জানি না, তোমার রাগ, ক্রোধ, হতাশা, অভিমান, লাজ-লজ্জা, ভয়, দুর্বলতা এসব জানতেও চাই না। যা জানতে চাই তা কেবল তোমার সারল্য, ক্ষমা করে দেওয়া, তুমি কতটা নিরহংকারী, আমার চেয়েও কী বেশি? নাকি পুরোটাই কুয়াশা!
যাক গে! আমি সে যুগের রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ হলে অবশ্যই লিখতাম- আমার ভেতর বাইরে অন্তরে অন্তরে আছো তুমি হৃদয়জুড়ে! কিন্তু আমি তো পলক আমাকে লিখতে হচ্ছে, ‘আমার থাকুক অন্তরগঙ্গার আছড়ে পরা ঢেউ, আমার থাকুক উদাস জলের ন্যায় ভীষণ অভিমানী কেউ!
মাঝে মাঝে আমি একটা ছেলেমানুষী স্বপ্ন দেখি ‘পৃথিবীর পথে পথে তোমাকে নিয়ে উদভ্রান্তের মতো ঘুরছি।’ দু’চোখ ভরে দেখছি নিসর্গ, রোমের স্থাপত্য, জেরুজালেমের আল-আকসা, মিশরের পিরামিড, আটলান্টিকার পেঙ্গুইন, ভিসুভিয়াসের আগ্নেয়গিরি, ফ্রান্সের ল্যুভর মিউজিয়াম; যেখানে আছে ম্যারি ম্যাগদালিনের আর্ট, বিখ্যাত মোনালিসা, দ্য লাস্ট সাপার। আবার কখনো তোমাকে আফ্রিকায় নিয়ে যেতে মন চায়।
কত যে অধরা স্বপ্ন দেখি তোমাকে নিয়ে, তার কোনো শেষ নেই। কখনো মনে হয় তোমায় নিয়ে অ্যামাজনের গভীর জঙ্গলে হারিয়ে যাব, প্রকৃতির শব্দ শুনব কাছ থেকে।
আবার মনে হয়, ভারতের শিলং আর কাঞ্চনজঙ্ঘা এখনো দেখা হয়নি ওগুলো তোমাকে নিয়েই দেখতে চাই। তোমার সঙ্গে কাশ্মীরের বরফে পা ফেলার অনুভূতি নিতে চাই, আর সিডনির অপেরা হাউসের সামনে বসে সাগরের দিকে তাকিয়ে বিভূতিভূষণের অপুর সংসার নিয়ে গল্প করতে চাই। ফিনল্যান্ডের তুষারপাত, আরবের মরুভূমিতে সন্ধ্যার সূর্যাস্ত দেখতে ইচ্ছে করে পাশাপাশি বসে। দুজনে মিলে মিসিসিপি নদীর জলে পা ভিজিয়ে একটু চুপ করে থাকলাম হয়তো সেই নীরব মুহূর্তটাই হবে সবচেয়ে শান্তিময়।
আমার তো খুব ইচ্ছে করে তোমাকে পাশে নিয়ে পুরো পৃথিবীটা দেখতে!
আবার কখনো মনে হয়, তোমাকে নিয়ে ভেনেজুয়েলা ও সুইজারল্যান্ডে যাব। নিয়ে গিয়ে তাদের বলবো তোমরা যে নিজেদের বিশ্বসেরা সুন্দর মানুষ বলো, দ্যাখো, আমার দেবী তোমাদের চেয়ে কত বেশি সুন্দর, কত বেশি ব্যক্তিত্ববান!
আমি জানি, এসবই বিভ্রম। কিন্তু জানো তো, মানুষ কল্পনায় পুরোপুরি স্বাধীন। তাই এই মুক্ত মনে হেলাল হাফিজের মতো বলতে চাই—
“ইচ্ছে ছিল রাজা হবো,
তোমাকে সম্রাজ্ঞী করে সাম্রাজ্য বাড়াবো।
আজ দেখি— রাজ্য আছে, রাজা আছে,
ইচ্ছে আছে,
শুধু তুমি নেই
আছ কিন্তু অনেক দূরে..”
মেটামরফোসিস লেখার আগে ফ্রানৎস কাফকাকে তার এক বন্ধু জিজ্ঞেস করেছিল, ‘এই নশ্বর পৃথিবীতে তোমার সবচেয়ে পছন্দের বস্তু কী?’ কাফকা উত্তরে বলেছিল, ‘প্রেয়সীর হাসি, সে হাসলে সমস্ত জগৎ হাসে।’ কাফকা আমার দেবীর হাসি দেখেনি, দেখলে হয়তো আত্মাহারা হয়ে যেত।
কিংবা জীবনানন্দ দাশ, বনলতাকে বর্ণনা করতে গিয়ে লিখেছেন, ‘চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা, মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য।’ তিনিও আমার দেবীকে দেখেননি, দেখলে কী যে লিখতেন আমার জানা নেই।
হোমার তার মহাকাব্য ওডিসিতে অ্যাফ্রোডাইটকে স্বর্গের রূপের দেবী হিসেবে বর্ণনা করেছেন, আর হেলেনকে করেছেন এই মর্ত্যলোকের সবচেয়ে সুন্দরী। আমি চিন্তা করে দেখেছি, আমার দেবীর কাছে তারা কিছুই না।
আবার মনে হয় তুমি বন্য পাখির মতো। ভালোবাসার শিঁকল দিয়ে তোমাকে খাঁচায় বন্দি করতে চাই না। পরাধীনতার বেড়ি পরাতে চাই না। তুমি স্বাধীনভাবে বাঁচো, দুচোখ ভরে দেখো নিসর্গ। তুমি আকাশে ওড়ো, পাহাড়ে যাও, ঝরনা দেখো, সমুদ্রে গিয়ে শুদ্ধ স্নান করো; তুমি চলিষ্ণু মেঘ স্পর্শ করো কিংবা নৃত্য করো মাতাল ছন্দে। আনন্দ করো, উচ্ছ্বাসে ভরিয়ে তোলো হৃদয়, চিৎকার করে গাও।
কিংবা আমাকে জাপটে ধরে কাঁদো, সমস্ত হতাশা, দুঃখ দিয়ে দাও আমার পাঁজরে। জানো তো, সমুদ্রেকে কোনো কিছুই উদ্বেলিত করতে পারে না। আমি কেবল তোমার হাসিটুকু দেখতে চাই, তোমার জীবনের শান্তি ও স্বস্তির পাশে নীরবে থাকতে চাই। তোমার পথচলায় এমন একজন সঙ্গী হতে চাই, যার উপস্থিতি তোমাকে কোনো অস্বস্তি না, বরং প্রশান্তি দেয়। তোমার পাশে থাকতে থাকতে হয়তো একদিন তোমার অনুভূতির ভেতরেই নিজের কিছুটা জায়গা খুঁজে পাব, কোনো দাবি, চাওয়া, পাওয়া, আাশা, প্রত্যাশা ছাড়াই।
পৃথিবীতে কেউ নিখুঁত নয় তবুও আমি তোমাকে বুঝতে, জানতে এবং সম্মান করতে চাই কারণ তুমি বিনয়ী, সুশ্রী, শুভ্র সত্তা যাকে আমি বহন করছি অনন্তকাল। তুমি আমার পদ্মাবতী, শবনম, বেনেট ডার্সি, তুমি চৈতালী, ক্ষণিকা, মঞ্জরী, লবঙ্গলতিকা, ইসাবেল, ক্লিওপেট্রা, রুদ্রাণী, অনামিকা, জুলিয়েট, পার্বতী, জুলেখা, হুররাম সুলতানা তুমি আমার প্রতিমা, আমার দেবী!
তুমি আমার হৃদয়-সমর্পণ করা
গত শতাব্দীর স্মৃতি।
তুমি বরেণ্য এক কাব্যের অপ্রকাশিত সংলাপের
গোপন বাণী।
তুমি গত জনমের ভুলে যাওয়া স্মৃতির
ব্যাবিলনের রানি।
ইতি
পলক
শহীদ